ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—হাজারো রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতিদিনের ভরসাস্থল। কিন্তু এত বড় একটি হাসপাতাল কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন বা সার্বক্ষণিক বিশেষায়িত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা উচিত কি না—এ প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ঘটনায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তা শুধু ফায়ার এক্সটিংগুইশার কিংবা জরুরি বহির্গমন পথের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।
এত বড় হাসপাতালে নিজস্ব ফায়ার স্টেশন কেন নয়?
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ও স্বজন এখানে অবস্থান করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন ভবনে একই সময়ে রোগী, চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতি থাকে।
আগুন লাগলে সাধারণ ভবনের তুলনায় হাসপাতালে ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ অনেক রোগী নিজেরা দ্রুত ভবন থেকে বের হতে পারেন না। আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, শিশু ওয়ার্ড, নবজাতক ইউনিট কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।
এ অবস্থায় হাসপাতাল চত্বরে যদি সার্বক্ষণিকভাবে প্রশিক্ষিত অগ্নিনিরাপত্তা দল, ফায়ার টেন্ডার এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম থাকে, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও রোগী উদ্ধারের সুযোগ বাড়তে পারে।
কাছাকাছি ফায়ার সার্ভিস থাকলেই কি যথেষ্ট?
ময়মনসিংহ শহরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন রয়েছে। সরকারি তথ্যেও ময়মনসিংহ ফায়ার স্টেশনের যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—হাসপাতালের মতো উচ্চঝুঁকির একটি স্থাপনায় শুধু বাইরের ফায়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভর করাই কি যথেষ্ট?
জরুরি মুহূর্তে কয়েক মিনিটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগুনের সূত্রপাত থেকে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত হাসপাতালের নিজস্ব প্রশিক্ষিত টিম যদি তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
প্রয়োজন নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া
শুধু ফায়ার স্টেশন থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন—
- হাসপাতালের প্রতিটি ভবনে কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম ব্যবস্থা;
- পর্যাপ্ত ও মেয়াদোত্তীর্ণ নয় এমন ফায়ার এক্সটিংগুইশার;
- জরুরি বহির্গমন পথ সবসময় খোলা রাখা;
- আইসিইউ ও শিশু ওয়ার্ডের জন্য বিশেষ উদ্ধার পরিকল্পনা;
- হাসপাতালের নিজস্ব প্রশিক্ষিত অগ্নিনিরাপত্তা দল;
- নিয়মিত ফায়ার ড্রিল বা মহড়া;
- বৈদ্যুতিক লাইন ও জেনারেটর ব্যবস্থার নিয়মিত পরিদর্শন;
- জরুরি অবস্থায় রোগী স্থানান্তরের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জনস্বার্থে জানতে চাওয়া যেতে পারে—
১. হাসপাতাল চত্বরে নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন বা ফায়ার ইউনিট স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
২. হাসপাতালের প্রতিটি ভবনের সর্বশেষ অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন কবে হয়েছে?
৩. অগ্নিকাণ্ডের সময় আইসিইউ, শিশু ওয়ার্ড ও গুরুতর রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কি?
৪. হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও মহড়া হয় কি?
৫. জরুরি মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত হাসপাতালে প্রবেশের জন্য আলাদা ও বাধামুক্ত ব্যবস্থা আছে কি?
দাবি নয়, এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের ভেতরে পূর্ণাঙ্গ ফায়ার স্টেশন স্থাপন বাস্তবসম্মত কি না, তা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি মূল্যায়নের বিষয়। তবে অন্তত একটি সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত হাসপাতাল ফায়ার-রেসপন্স ইউনিট এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম থাকা উচিত কি না—এ বিষয়ে এখনই জনস্বার্থে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
কারণ হাসপাতালে আগুন মানে শুধু একটি ভবন পুড়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য অসুস্থ মানুষের জীবন।
আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস ডাকব—নাকি আগেই এমন ব্যবস্থা করব, যাতে আগুনের প্রথম কয়েক মিনিটেই জীবন রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই খোঁজা দরকার।

